Ebooks

শ্রী অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চীন ও পাথর মায়ের ছেলে’ বইটি পড়তে পড়তে আজকের পাঠকের বার বার মনে পড়ে যাবে ১৯৬১-তে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্য জর্জ মেকলে ট্রেভেলিয়ান বক্তৃতা দিতে গিয়ে কেম্ব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপক, প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ই এইচ কারের নির্দিষ্ট করে দেওয়া কতকগুলি সূত্রের কথা। কার সেখানে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন মানবেতিহাসের কতকগুলি গোড়ার বিষয়কে। তাঁর নির্দ্বিধ বক্তব্য ছিল, ‘হিস্ট্রি ইজ দ্য লং স্ট্রাগল অফ ম্যান, বাই দ্য এক্সারসাইজ অফ হিজ রিজন, টু আন্ডারস্ট্যান্ড হিজ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড টু অ্যাক্ট আপঅন ইট।’ নিঃসন্দেহে ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে এটাই হল গোড়ার কথা, অন্তত আজকের দিনে। দৃষ্টিভঙ্গির বদলের জায়গা থেকেই আজ আমাদের ইতিহাসচর্চার মূল অবলম্বন আর রাজা-রাজড়ার ক্ষমতা বিস্তারের উদ্দেশ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধবিগ্রহ এবং জয়-পরাজয় নয়, আমরা এখন ইতিহাসের মধ্যে কার-কথিত ঐ রিজনকেই টের পেতে চেষ্টা করি। করি মূলত আমাদের চারপাশকে বুঝতে এবং সেই বোঝার মাধ্যমে, ‘টু অ্যাক্ট আপঅন ইট’ বলে কার সেদিন যা বোঝাতে চেয়েছিলেন সেই পথে , চারপাশকে বদলাবার চেষ্টা করতেই। অর্থাৎ ইতিহাসচর্চা আজ আর নিছক দিনক্ষণ আর সাল-তারিখ সম্বলিত নীরস তথ্যচর্চা নয়, বরং, বিশেষ করে এই বিশ্বায়নের দিনে বসে, তার হয়ে ওঠার কথা মানুষের ‘হয়ে-ওঠা’-র গতিপ্রকৃতিকে উপলব্ধি করার উপায়ও। উপায় বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার ক্রমশ ব্যাপ্ত হতে থাকা সীমানাকে ছাপিয়ে উঠে ভিন্নতর মানবতার চর্চায় ব্যাপৃত হবার চাবিকাঠিও, একই সঙ্গে। শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল বিস্তারী এই রচনাকর্মের মূলে রয়েছে এই মানবতা চর্চারই দৃষ্টিকোণ। দীর্ঘ এই বইয়ের পাতায় পাতায় তিনি যে কেবল আজকের বিশ্বে বিশিষ্টতম হয়ে ওঠা একটি দেশের প্রাগাধুনিক ইতিহাস ও তাকে আধুনিক বিশ্বভাবনার এগিয়ে দিতে গিয়ে প্রাণপাত করা সে দেশের কর্ণধারের ভাবনা ও কর্মের হদিশই আমাদের দিতে চাননি, সেই সঙ্গে ধরে দিতে ও বুঝে নিতে চেয়েছেন সমসাময়িক বিশ্বে সেই ভাবনা ও কর্মের অভিঘাতকেও। শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় একটি দেশের জীবনপর্বের একটি বিশেষ পর্বাধ্যায়ের কালিক- ইতিহাসমাত্র লিখতে চাননি; তিনি ভিতর থেকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন সেই দেশের মানুষকে, তাদের ভাবনাবিশ্বকে। এবং গ্রন্থশেষে দীর্ঘ পাঠতালিকা প্রমাণ করে সেই বুঝতে চাওয়ার গভীরে তিনি কেবল তত্ত্বের প্রতিই তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেননি, বরং খোলা চোখেই তাকাতে চেয়েছেন। সে অর্থে এ বই ইতিহাস বটে, তবে কিনা তা কেবলমাত্র ভাবনার ইতিহাসই ওঠেনি, কর্মের ইতিহাসকেও ধরে রাখতে চেয়েছে। এবং সেই ভূমি থেকে দেখলে, একই সঙ্গে,  এ বই কেবল এক বিশ্বদৃষ্টির বিবর্তনগত ইতিহাসই হয়ে ওঠেনি, ভিতরে-বাইরে ক্রমাগত সংঘাত-সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে একদল মানুষেরই কেবল নয়, গোটা একটা দেশের অবিরাম বদলে যাবার ইতিহাসও হয়ে উঠেছে। ফলে কেউ যদি এখানে মাওবাদের বিবর্তনের ইতিবৃত্ত আশা করেন তাহলে তিনি যেমন বিব্রত হবেন, তেমনি একই সঙ্গে বলার যে, কিয়দংশে হবেনও না। চীনের সভ্যতার ইতিহাসের প্রেক্ষিতে লেখক মাও-পর্বকে অবশ্যই অনুসরণ করেছেন, তবে সে অনুসরণ কখনোই নিছক তাত্ত্বিক নয়, বরং অনেকটাই তার জীবনপ্রবাহের বয়ে যাবার পথ ধরে। ফলে এ-ইতিহাস একই সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাস তো নিশ্চয়, সেই সঙ্গে আবার, রাজনৈতিক বলেই, একটা বিশেষ দেশে ও কালে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব ও বিকাশেরও ইতিহাস বটে। একই সঙ্গে। কোনো তত্ত্বের বা ইজমের আলোয় এই প্রবাহকে বাঁধার চেষ্টা করেননি বলেই লেখক এখানে পাঠকের ধন্যবাদের পাত্র হয়ে উঠেছেন অচিরেই, এ বই যত এগিয়েছে। তিনি একদল মানুষের বেঁচে থাকাকে, কেবল বাইরে থেকেই নয়, ভিতর থেকেও একটা গতিপথ দেবার কাহিনিকে, কেবল তুলেই ধরেননি, সেই  তুলে ধরাটাকে নিজের জায়গা থেকে বিশ্লেষণও করতে চেয়েছেন। সেই বিশ্লেষণ নিয়ে, তার ব্যাখ্যা নিয়ে, সেই বিশ্লেষণের উপাদান ও পদ্ধতি নিয়ে যত তর্কই থাকুক, বহুকৌণিক এই প্রয়াসকে সামনে রেখে আজকের ক্রমবিবর্তমান বিশ্বভাবনাকে যদি কেউ বুঝতে চেষ্টা করেন মনে হয় তিনি উপকৃতই হবেন। অসুস্থ শরীরকে ছাপিয়ে উঠে এই বিপুল কর্মকাণ্ডে লেখক ফের প্রমাণ করলেন, মানুষ শক্তির উৎস। তাঁর এই প্রয়াস আমাদের সম্পদ হয়ে থাকুক।
©2019 GoogleSite Terms of ServicePrivacyDevelopersArtistsAbout Google|Location: United StatesLanguage: English (United States)
By purchasing this item, you are transacting with Google Payments and agreeing to the Google Payments Terms of Service and Privacy Notice.