Dekha-Third Edition (Bengali)

Smriti Publishers
Free sample

 ‘দেখা’ অনেক দিক দিয়েই আমার সাহিত্য জীবনের মাইলস্টোন ।
এই উপন্যাসে রাবীন্দ্রিক ছোঁয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয়ে, একবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারে নতুন রূপে পদার্পণ। নতুন আঙ্গিকে, আজকের কথোপকথন ইংরেজি-বাংলা মেশানো রচনাশৈলী নিয়ে। হয়ত বাংলা ভাষার বিবর্তনে আগামীর দিশা। রবীন্দ্রোত্তর যে লেখা প্রকাশিত হয়েছে, সবই একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে। সরাসরি গল্প বলা। দেখার জাম্পকাট স্টাইল অন্যান্য সাহিত্যের থেকে ভিন্ন। বিদেশে থাকা, শ্রাবস্তির ইটোনিয়ান অ্যাক্সেন্ট দেশে কাটানোর পর কীভাবে বাংলা ভাষায় বিবর্তিত হল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাংলা সাহিত্যর প্রগতিতে ধ্রুবতারা ।

প্রকাশনা জগতের অপকীর্তি, এই উপন্যাস, লেখালেখির সঙ্গে আমায় প্রকাশনার দুনিয়ায় আনে। প্রকাশকের গতের চিন্তাধারা ও খামখেয়ালিপানা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের প্রকাশনা স্মৃতি পাবলিশার্সের স্থাপন, বিন্যাস ও বিস্তার ।
বারবার বেস্টসেলারই হয়নি, এখন পর্যন্ত আমার যত প্রকাশিত উপন্যাস, সর্বাধিক বিক্রিত ও আদৃত। বহুবার অনুমতি ছাড়া গল্পটিকে টুকতে গিয়ে বাংলা ছায়াচিত্র জগৎও বেকায়দায় পড়ে। রিলিজ আটকে অবশেষে আমার গল্প অনুকরণ বন্ধ করেছে। তাতেই প্রমাণ এই উপন্যাসের নিজস্বতা ।
উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশ উদ্বোধন হয়, মায়ের হাতে, আমার জন্মদিন ১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৯, গোর্কি  সদনে। তাঁকে উৎসর্গ করা বলেই তাঁর আশীর্বাদ এই বইটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে। সব বাধা বিঘ্ন কাটাতে সহায়ক হয়েছে। এই উপন্যাসের হাত ধরেই আমার ইংরেজি সাহিত্যে পদার্পণ। দেখার ভাবানুবাদ The Vision দিয়ে ইংরেজি সাহিত্য যাত্রা শুরু ।
আজকের যুগ-দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তব কাহিনির মধ্যে দিয়ে দেখতে চেষ্টা করেছি শাশ্বত দ্বন্দ্ব ও সত্যকে। মানুষের চিরন্তন চাওয়া-পাওয়া, যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্ন। ফলে দু’প্রান্তে জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, সমগ্র যাপনচিত্রটাই মানুষের মধ্যে বিশাল তফাত গড়ে দেয়। সেখানেও কোথাও-বা মিলনের আর্তিটুকু রয়ে যায়। যা অনেকটা সাগরের সঙ্গে আকাশের মিলনে ব্যবধানরেখার বিস্তারের সঙ্গে তুলনীয়। দৃশ্যমান অথচ অগম্য। নিঃসঙ্গতার ফাঁক পূরণ করাটা ইদানীং সর্বত্র বহুজনের কাছেই যথেষ্ট কষ্টকর। যে ধারণাটা ক্রমশ চারদিকেই প্রকট হয়ে উঠছে। কাহিনির বিস্তারে চরিত্রগুলোর অবস্থান, তাদের একাকিত্ব বা সংঘবদ্ধ বিচরণ ক্ষণস্থায়ী না কি চিরস্থায়ী সেই সিদ্ধান্ত পাঠকের। যুগের বিবর্তনে তা কতটা ছাপ রেখে যাবে, সময়ই বলে দেবে ।
কালকের সাহিত্যকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য  স্মৃতি পাবলিশার্স প্রকাশনাকে ধন্যবাদ। আর আমার স্ত্রী স্মৃতি বসুকে, যার ধৈর্য, সহায়তা ও উৎসাহ না থাকলে আমার চর্চা বিকশিত ও প্রস্ফুটিত হত না।

 কলকাতা,

                                                                                                 অনিরুদ্ধ বসু

Read more

About the author

 Aniruddha Bose was born on 19th September 1955 in Kolkata. His father was Late Binayendra Mohan Bose an ex-graduate from Bengal Engineering College who later rose to position the position of Director of Employment and Training and Central Apprenticeship Advisor, Govt. of India, who died in harness as the Project Manager, United Nations Development Programme. His mother was the silver medal winner in her Master’s qualification from the Calcutta University in Bengali. Aniruddha Bose is a by-product of St.Xaviers’ Collegiate School, Kolkata and later from Medical College Bengal. In 1985, he completed his FRCS from United Kingdom and spent a considerable segment of his life there and a part of his professional career in the Middle East.
In his professional interaction, he has intermingled with various cultures, races, and community as a whole. He has travelled extensively in different capacities to most of the countries of the world. Now he is one the renowned plastic surgeons of Kolkata and he is known as one of the leading cosmetic surgeons in India and abroad.
He has now written several books in Bengali and English.

Read more

Reviews

Loading...

Additional Information

Publisher
Smriti Publishers
Read more
Published on
Jun 6, 2017
Read more
Pages
136
Read more
Language
Bangla
Read more
Genres
Fiction / General
Read more
Content Protection
This content is DRM protected.
Read more
Read Aloud
Available on Android devices
Read more

Reading information

Smartphones and Tablets

Install the Google Play Books app for Android and iPad/iPhone. It syncs automatically with your account and allows you to read online or offline wherever you are.

Laptops and Computers

You can read books purchased on Google Play using your computer's web browser.

eReaders and other devices

To read on e-ink devices like the Sony eReader or Barnes & Noble Nook, you'll need to download a file and transfer it to your device. Please follow the detailed Help center instructions to transfer the files to supported eReaders.
Aniruddha Bose
 অনিরুদ্ধ বসুর নতুন উপন্যাসটির ভূমিকা লেখার আগে পাণ্ডুলিপিটি পড়ে শেষ করলাম। বইটা পড়ার সময় এবং পড়ার পরে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। এক কথায় অনুভূতিটা বোঝানো যাবে না। বিরক্তি, রাগ, দুঃখ, হতাশা এবং আশা, সব কিছু আবেগের আঁচে আর যুক্তির ছুরিতে তালগোল পাকিয়ে গলার কাছে একটা অব্যক্ত কান্নার দলা হয়ে আটকে গেল।
সত্যি কথাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে রীতিমতো সাহস লাগে। সর্বক্ষেত্রে বাঙালির পিছিয়ে যাওয়াটা দুঃখের, কিন্তু ভয়ের নয়। সাময়িক পিছিয়ে পড়াটা জাগতিক নিয়মের মধ্যেই পড়ে। পিছিয়ে পড়লেও আবার এগোনো যায়, যদি ...

এই যদিটাই এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। এই যদিটা যখন মানসিক ক্লীবত্বে পরিণত হয়, তখনই হয় ভয়। বাংলা এবং বাঙালির ভবিষ্যতের জন্য ভয়। মানসিক জড়তা জন্ম দেয় এক আশ্চর্য উন্নাসিক কূপমণ্ডুকত্ব। তার প্রধান লক্ষণ অতীতকে আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যতকে অস্বীকার করা। ‘এই বেশ ভালো আছি’ মানসিকতা যখন মিশে যায় ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’ আর ‘আমি বা আমরাই শ্রেষ্ঠ’ মনোভাবের সঙ্গে, তখনই ঘটে একটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা জাতির অবক্ষয়। তখন কেউ এদিকে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলে তাকে প্রথমে উপেক্ষা, তারপর বিদ্রুপ এবং তারপর ছোট করার চেষ্টা করা হয়।

অনিরুদ্ধ বসু তার নতুন উপন্যাস ‘স্ফুলিঙ্গ’-তে এই কঠিন অপ্রিয় কাজটি করার চেষ্টা করেছে। কলা বা কৃষ্টি ক্ষেত্রে বাংলা ও বাঙালি যে ক্রমাগত পিছিয়েই যাচ্ছে, মধ্যমেধার রাজত্বে যে নতুন প্রতিভাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেওয়ার একটা ঘোর চক্রান্ত চলছে, অনিরুদ্ধ বসুর সাহসী কলমে তা উঠে এসেছে।

কিন্তু অনিরুদ্ধ বসু শুধু কালো রঙটাই দেখায়নি। ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন শ্মশানভূমি থেকে আলোর পাখি ফিনিক্সের উঠে আসার মতো তার উপন্যাসের প্রটাগনিস্টের লড়াই করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার গল্পও শুনিয়েছে।

আজ অনিরুদ্ধ বসুর উপন্যাসটির ভূমিকা লিখতে বসে একটাই কামনা করছি, এই কাল্পনিক ‘স্ফূলিঙ্গ’ সত্যের দাবানলে পরিণত হয়ে বাংলার কৃষ্টিজগতের পূঞ্জীভূত জঞ্জালে খাণ্ডবদহনের সৃষ্টি করুক, যাতে সেই পোড়ামাটির গর্ভ থেকে ফিনিক্সের মতো নতুন প্রজন্মের প্রতিভাশালী অঙ্কুরগুলি জন্মায় এবং কালক্রমে মহীরূহে পরিণত হয়।
Aniruddha Bose
ভিবজিওর শব্দটার অর্থ আমাদের সবারই জানা। সূর্যের সাদা আলোর বর্ণালির সাত রং-এর ইংরেজি আদ্যক্ষরগুলিকে পরপর সাজালে এই শব্দটি পাওয়া যায়। তার মানে সাদা রং ভেঙে এই সাতটি রং মেলে। বিপরীত ভাবে দেখলে, সাতটি বিভিন্ন রং মিলে তৈরি হয় সাদা রং। 
পিওর ম্যাজিক! 
আবার এই দৃশ্যমান রং-এর জগতের ওপারে আছে এক রংহীন জগৎ, অতি বেগুনি আর লাল উজানি আলোর এক ভিন্ন রাজ্য। সেখানে পৌঁছতে পারলে কোথায় রং? মানুষের চোখ সেখানে হয়ে পড়ে অকেজো। অনুভূতির অন্য স্তরে সেখানে বিরাজমান অন্য ইন্দ্রিয়ের অনন্য অনুভূতি। 
মানুষও ঠিক এ রকম নয় কি? প্রতিটি মানুষের চরিত্রই তো কত রকম রং-এর, সাত বা সাতাত্তর, কেউ কি খেয়াল করে? কখনো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে একটি বিশেষ রং, আর দর্শকরা বলে ‘বাঃ!’ কখনো বা ঝলসে ওঠে অন্য কোনো রং, আর সেই দর্শকরাই অবাক হয়ে বলে ‘আরে, এরকম তো আগে দেখিনি!’ আসলে সবই তো সেই জীবন নামক প্রিজমের খেলা। একই জন, বিভিন্ন প্রকাশ। আরও গভীরে যদি কেউ ডুব দেয়, তবে হয়তো পৌঁছে যাবে সেই রং-এর ওপারের অপ্রকাশ জগতে, যেখানে একজন বর্ণময় মানুষ হয়ে ওঠে অবচেতনের আবছায়া। 
এই যে মানব চরিত্রের রং-এর খেলা, এটা দেখার এক টুকরো খোলা জানালা অনিরুদ্ধ বসুর এই উপন্যাসটি। অনিরুদ্ধ বরাবরই নতুন নতুন আঙ্গিক নিয়ে লেখে। লেখা নিয়ে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট করে। এই উপন্যাসটি এক নতুন ধারায় লেখা। একই নারীকে নিয়ে সাতটি ছোটগল্প, আর তারপর সব মিলে মিশে একটি উপন্যাস – এ যেন সেই সাত রং-এর খেলা। ভিবজিওর মিলে মিশে সাদা। 
তারপর কেন্দ্রীয় চরিত্রটি (প্রথাগত নায়িকা বলতে আমার কুণ্ঠা হচ্ছে!) এক সময় খুঁজে পায় তার রঙিন বাইরের খোলসের অন্দরের গভীর বর্ণহীন অন্তর্সত্ত্বাকে। এ যেন ভিবজিওরের ওপারের অতি বেগুনি বা লাল উজানি আলোর খোঁজ পাওয়া।
জানি না, আর কেউ এ ভাবে মানবী চরিত্র বিশ্লেষণ করে উপন্যাস লিখেছেন কি না। তবে বাংলা ভাষায় আমরা যারা মেন স্ট্রিমের বাইরে দাঁড়িয়ে, নতুন কিছু বলার বা লেখার চেষ্টা করছি, তারা স্বতঃস্ফূর্ত সাধুবাদ জানাচ্ছি অনিরুদ্ধকে, তার এই অসাধারণ প্রচেষ্টার জন্য। 

আশা করি মননশীল পাঠকরাও একমত হবেন। 

Aniruddha Bose
সীমা আর অসীম...

না, নায়ক নায়িকার নাম নয়। কবিতাও নয়, নিতান্তই কঠোর গদ্য।

সীমা কী? কীসের সীমা? জানার? না অজানার? না কি অন্য কিছুর? মানবমনের? না কি মানব-চেতনার? অসীমই বা কী? কবি বলেন এক, আর গণিতজ্ঞ বলেন আরেক। আর মাঝখানের যে সাধারণ মানুষ, তারা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাদের কাছে সীমা হচ্ছে জানার সীমা। অসীম হচ্ছে জানার সীমানার বাইরের একটা রহস্যময় কিছু। চেতনার বাইরের একটা অবচেতন বা অতিচেতন স্তর।

সাধারণ পাঠক এতেই বিরক্ত হয়ে হাই তুলবেন। সীমা-অসীম, চেতন-অবচেতন-অতিচেতন এসব ইন্টেলেকচুয়াল তত্ত্বের কচকচানি শুনে কী লাভ? কিন্তু কেউ কেউ হয়ত স্রোতের বাইরে। মধ্যমেধার রাজত্বের বিবর্ণ ধুসর প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে একাকি হেটে চলা এই বিরল দুঃসাহসী অভিযাত্রীরা ভাবেন এই সব নিয়ে। তাঁদের অনুসন্ধিৎসু চেতনার অস্পষ্ট ধ্যানালোকে ডাক আসে এক আশ্চর্য স্পন্দনে নিরন্তর স্পন্দিত হওয়া অতিচেতনের, শুষুম্না ঈড়া পিঙ্গলার দ্বার বেয়ে বয়ে চলা এক অবচেতন থেকে অতিচেতনে উত্তরনের আহ্বানের। জাগতিক দিকচক্রবালের নিঃঝুম আকাশগঙ্গায় স্নান করে ওঠা অস্পষ্ট মুক্ত আত্মার বিমূর্ত বর্ণহীন অবয়ব ভেসে যায় অসীমের দিকে। যাঁরা এই আহ্বানের মূক ভাষা বুঝতে পারেন, তাঁরাই সীমা আর অসীমের চিরন্তন দ্বন্দ্বের পরপারে চলে যাওয়ার পথটির সন্ধান পান। সন্ধান পান সীমা-অসীম ছাড়িয়ে সেই যে পরম অজ্ঞেয় ক্ষেত্র, সেই তূরীয়লোকের, আজ্ঞাচক্রের পথ ধরে সহস্রারের সেই পরমচেতনার অন্তিম আশ্রয়ে।

কিন্তু সেই ডাক শোনে কয় জনা? শুনতে পেলেও বোঝে ক’জন? বুঝলেও চেনাজানা সীমার নিরাপত্তার বাইরে পা বাড়াবার সাহস খুঁজে পায় ক’জন?

তবে কেউ কী পায় না?

না পায়। কেউ কেউ পায়। তারা বিরল। তারা ব্যতিক্রমী। তারা প্রায় সব সময়েই সমসাময়িকদের মাঝে একটা রহস্যময় চরিত্র, একটা এনিগমা। বা, পাগল!

এই রকম একটি চরিত্র অনিরুদ্ধ বসুর সাহসী সৃষ্টি ‘আলো আঁধার’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রটি। সে একটি মেয়ে। নাম? নামে কিছু যায় আসে কী? শ্যামা রমা বিশাখা দেবী বনলতা – নাম যাই হোক না কেন, সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয় যেখানে মানবিক সঙ্কট প্রবল সেখানেই অস্তিত্বচিহ্ন গুরুত্বহীন। যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হল তার চরিত্র। অতি সাধারণ চেনা জানা মেয়েটি জীবনের ঘটনাবহুল স্রোতে ভাসতে ভাসতে আর হাজারটা চরিত্রের মতো গড্ডালিকা প্রবাহে হারিয়ে গেল না, ভাগ্যের এক আশ্চর্য খেলায় সে হঠাৎই খুঁজে পেল জীবনের রহস্য সন্ধানের চাবিকাঠি। আলো আর আঁধারের চোখ ধাঁধানো খেলার মধ্য দিয়ে, হাজারটা চরিত্রের কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্যের বেড়াজাল ভেঙে, নিজের সীমা পেরিয়ে সে পাড়ি দিল অসীমের খোঁজে। না কি তারও ওপারে? একদিন যে জ্ঞানের বিদ্যুতাগ্নি তার চেতনাকে শিখিয়েছিল ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম’, যে জ্ঞানজ্যোতিঃ একদিন তার কাছে উদাত্ত কণ্ঠে গেয়েছিল তার অবচেতনের ঘুমভাঙানিয়া সঙ্গীত ‘অয়মাত্মানং ব্রহ্ম’, একদিন সেই জ্ঞানের আলোই তাকে বুঝতে শেখাল সীমা আর অসীমের আপাত বিভেদের অন্তস্থলে লুকিয়ে থাকা অভেধ সত্য ‘তৎত্বম অসি’। সেই জ্ঞানই অবশেষে তাকে নিয়ে গেল সীমা-অসীমের ওপারে এক একমেবাদ্বিতীম সত্যে – ‘অহম ব্রহ্মাস্মি’-র অতিচেতনে।

বইটির পাণ্ডুলিপি শেষ করার পর অনিরুদ্ধ বসুর এই অসাধারণ সৃষ্টিকে কী বলে সাধুবাদ জানাব ভেবে পাচ্ছিলাম না। বহুমাত্রিক এই উপন্যাসটি হয়ত সবাই একই দৃষ্টিতে দেখবেন না। সেটা সম্ভবও নয়, কাম্যও নয়। শুধু এই আশা করব, এই অপূর্ব কাহিনিটি কিছু সেরিব্রাল পাঠককে ভাবনার খোরাক যোগাক।

এমন একটি গণ্ডিভাঙা ব্যতিক্রমী উপন্যাস উপহার দেওয়ার জন্য লেখকের কাছে বাংলা উপন্যাস-সাহিত্য ঋণী থাকবে, যদিও এ আমার নিজস্ব অনুভূতি।

ধন্যবাদান্তে

আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

 

Aniruddha Bose
ব্যতিক্রমী উপন্যাস লেখার দুটো দিক আছে। একদিকে যেমন বিদগ্ধ মহলে তা বিশেষ সমাদৃত হয়ে বেস্টসেলার হয়ে যায়, অন্যদিকে কিছু সমালোচকদের হাতে পড়ে অর্থহীন লেখার আখ্যা পায়। পত্র-সাহিত্যের চেনা গতে ফেলে ওরা খুঁজতে চায় চিরায়ত একটি ভ্রমণ কাহিনি ও গতানুগতিক বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে কোনো পরকীয়া প্রেমের বিন্যাস। যেটুকু থাকবে সরল চিন্তার মায়াজালে জড়িয়ে।

পত্র-সাহিত্য হিসেবে লেখা হলেও, ‘তোমাকে…’ যে তার পরিধি ছাড়িয়ে সময়ের অন্দরমহলে পৌঁছে গেছে এবং সময়ের লিনিয়ারিটি ভেদ করে তার চতুর্থ মাত্রা বা ফোর্থ ডাইমেনশন ‘উলম্ব সময়’, যা ‘ভারটিক্যাল টাইম’ তার হাত ধরে পৌঁছে গেছে তূরীয় লোকে। সাধারণ পাঠক এত কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে যে, সেই কঠিন ধারণা আস্বাদন করতে ব্যর্থ হয়।

আসলে যে যেভাবে দেখে, কিংবা দেখতে চায়, বা দেখতে অভ্যস্ত, এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই আসল। থমকে দাঁড়ানো সংকীর্ণ ভাবনার অচলায়তনে আজকের দিনে প্রাসঙ্গিক কোনো চিন্তাধারা মেলে ধরাই ছিল লেখাটির মুল উদ্দেশ্য।

প্রথম সংস্করণে সেই ভাবনার যথাযথ প্রকাশ ঘটেনি বলে বহু পাঠকের অভিযোগ ছিল। সেই বক্তব্যকে শ্রদ্ধা জানিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি বিষয়টিকে সহজভাবে তুলে ধরার। এরপর পুরোটাই পাঠকের হাতে ছেড়ে দিলাম।

এই কাহিনিতে যৌথ সম্পর্কের জটিলতা প্রধান আলোচ্য বিষয়। যে চিরন্তন সম্পর্ক চেনা গতে মিশে গেছে কাল্পনিক সময়ে। যেখানে ‘সময়’ বাধাহীন, অনন্ত বলে আমাদের কাছে পরিচিত। মানুষের মনে সত্য-মিথ্যা, ঠিক-ভুল, সম্ভব-অসম্ভব, জানা-অজানা, বোঝা ও না-বোঝার চিরকালীন দ্বন্দ্বর প্রতিফলন।

ব্যবহারিক জীবনে নানা সমস্যা আমরা এতটাই নিজের মতো করে পেয়ে থাকি যে, তাদের সঠিক রূপ আমাদের কাছে বহু সময়ে ভীষণভাবে অস্পষ্ট হয়ে যায়। অত্যন্ত প্রয়োজনেও আমরা না-পারি জানতে, না-পারি তার থেকে বেরিয়ে আসতে। ঘুরপাক খেতে থাকি গতিহীন মননে সময়ের আবর্তে। এবং তখনই নিজেকে আবার তৈরি করতে হয়, মনকে গড়ে তুলতে হয় চিরন্তন মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। সেই মুক্তি যতই তাৎক্ষণিক হোক না কেন, আমাদের চাহিদার কাছে সেটুকু অত্যন্ত জরুরি।

দিনের শেষে বা বলা ভালো সারাদিন, প্রত্যেকের নিজের জন্য একটু স্পেস খুব দরকার। যেখানে এসে প্রতিটা ব্যক্তিত্ব নিজের সামনে দাঁড়ায়, নিজেকে ঝালিয়ে নেয় বা কার্যক্রম তলিয়ে দেখে। সেটুকুর জন্যই বোধহয় প্রতিটা মানুষের কিছুটা নীরবতাও প্রয়োজন। নৈঃশব্দ্য আমাদের অনেকটা ইন্ধন জোগায়।

সমতল থেকে পাহাড় হয়ে আবার সমতলে ফেরা। শেষ পর্যন্ত না পড়লে লেখাটির কেন্দ্রবিন্দুতে কতটা পৌঁছনো যাবে তা নিয়ে সন্দেহ থাকেই। সময়ের ব্যাপ্তিতে লেখাটির স্থান কোথায়, সময়-ই বলে দেবে। লেখক হিসেবে চেষ্টা করেছি গতিশীল বাংলা সাহিত্যকে, একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। আজ পুনঃপ্রকাশনার প্রাক্কালে এক বন্ধুর একটি কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল -

 

Aniruddha Bose
In his book Poetics, the Greek philosopher Aristotle, asserted suspense is the fulcrum of all thrillers, with a fusion of trepidation, thrill, expectancy, anxiety, collocated with a feel of pandering tensity, captivation, fright, fervour. The readers seize with teeth the plot, as it converges to an aleatory, cryptic and stirring climax, leaving them to ruminate.Typically, a baddie-driven one, balked by red herrings, twists, to a bewitching cliff-hanger. Pigeon-holed, the author destroys hope, elicits curiosity and springs surprise, out of the blue. This is the form of the customary mystery, psychologic, political or romantic sub-genres.Gone are the days of ancient epics, Epic of Gilgamesh, Homer's Odyssey, Mahābhārata. With evolving era, the art of story-telling has undergone radical mutation.Revering them, my attempt was to carve a new scientific sub-genre relevant to this era. The prevalent construct of private detective is trompe-l’oeil. My debut to the ambit was with a novel perception, flouting the abstruse idea with a realistic one. Among the legion deaths, deputed buffs could carry the probe. Many quotidian folks could astutely scrutinise the conundrum, until one hits the final bonanza.With this scalage, it capsized the age-old detective myths initiated by Edgar Ala Poe, to a realistic podium. Though probe was by apposite folks, solution came from the victor. In my first mystery novel, CHAKRA (Bengali 2010) later as FULCRUM (English 2013), amongst heretical ways of several murders, the booklover is in pursuit of the killer-boffo duo. Later, in PURSUIT (2013), besides original homicidal methods, I ciphered a subtly furtive profound insight into extropy of global dynamics. I fused the elided outlook of tralatitious thrillers with a philosophy for humanity. The traditional ‘protagonist’ waffled between effector and the seer.Scientific thrillers involve a sixth sense into the core of science, history, evolution with a far-flung eagle view of progress. ETERNAL MAYHEM is one of such kind spotless adrenaline raiser, a touch chalk and cheese grand narrative with numerous puzzling scientific murders occurring worldwide. This complex cliff-hanger keeps the reader’s adrenaline spurting from the onset as scientific murders take place in exotic global locations. Beautiful lassies, intelligentsia, global scientists are trapped in this white-knuckle masterpiece with all the twirl and twists that will keep the readers rapt.This volume is more than a murder mystery, to transport you from your comfy lounger to a steaming isle, be it Bali, Fiji, Hawaii, Maldives, Bora Bora, Punta Cana or exotic nooks of Jamaica and Puerto Rico. This gripping craft keeps you on your feet, as the global scientific world of genetics gets swathed in the whodunit.  Amid the scientific essence of genetic cloning research, it’s a scarper from the familiar concepts, to the roots of civilisation with its resultant diversities. It reveals shocking truths, so far clandestine. The apogee seals in a startling eye-opening truth of humanity, offering a thought-provoking riveting thriller.
Aniruddha Bose
সীমা আর অসীম...

না, নায়ক নায়িকার নাম নয়। কবিতাও নয়, নিতান্তই কঠোর গদ্য।

সীমা কী? কীসের সীমা? জানার? না অজানার? না কি অন্য কিছুর? মানবমনের? না কি মানব-চেতনার? অসীমই বা কী? কবি বলেন এক, আর গণিতজ্ঞ বলেন আরেক। আর মাঝখানের যে সাধারণ মানুষ, তারা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাদের কাছে সীমা হচ্ছে জানার সীমা। অসীম হচ্ছে জানার সীমানার বাইরের একটা রহস্যময় কিছু। চেতনার বাইরের একটা অবচেতন বা অতিচেতন স্তর।

সাধারণ পাঠক এতেই বিরক্ত হয়ে হাই তুলবেন। সীমা-অসীম, চেতন-অবচেতন-অতিচেতন এসব ইন্টেলেকচুয়াল তত্ত্বের কচকচানি শুনে কী লাভ? কিন্তু কেউ কেউ হয়ত স্রোতের বাইরে। মধ্যমেধার রাজত্বের বিবর্ণ ধুসর প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে একাকি হেটে চলা এই বিরল দুঃসাহসী অভিযাত্রীরা ভাবেন এই সব নিয়ে। তাঁদের অনুসন্ধিৎসু চেতনার অস্পষ্ট ধ্যানালোকে ডাক আসে এক আশ্চর্য স্পন্দনে নিরন্তর স্পন্দিত হওয়া অতিচেতনের, শুষুম্না ঈড়া পিঙ্গলার দ্বার বেয়ে বয়ে চলা এক অবচেতন থেকে অতিচেতনে উত্তরনের আহ্বানের। জাগতিক দিকচক্রবালের নিঃঝুম আকাশগঙ্গায় স্নান করে ওঠা অস্পষ্ট মুক্ত আত্মার বিমূর্ত বর্ণহীন অবয়ব ভেসে যায় অসীমের দিকে। যাঁরা এই আহ্বানের মূক ভাষা বুঝতে পারেন, তাঁরাই সীমা আর অসীমের চিরন্তন দ্বন্দ্বের পরপারে চলে যাওয়ার পথটির সন্ধান পান। সন্ধান পান সীমা-অসীম ছাড়িয়ে সেই যে পরম অজ্ঞেয় ক্ষেত্র, সেই তূরীয়লোকের, আজ্ঞাচক্রের পথ ধরে সহস্রারের সেই পরমচেতনার অন্তিম আশ্রয়ে।

কিন্তু সেই ডাক শোনে কয় জনা? শুনতে পেলেও বোঝে ক’জন? বুঝলেও চেনাজানা সীমার নিরাপত্তার বাইরে পা বাড়াবার সাহস খুঁজে পায় ক’জন?

তবে কেউ কী পায় না?

না পায়। কেউ কেউ পায়। তারা বিরল। তারা ব্যতিক্রমী। তারা প্রায় সব সময়েই সমসাময়িকদের মাঝে একটা রহস্যময় চরিত্র, একটা এনিগমা। বা, পাগল!

এই রকম একটি চরিত্র অনিরুদ্ধ বসুর সাহসী সৃষ্টি ‘আলো আঁধার’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রটি। সে একটি মেয়ে। নাম? নামে কিছু যায় আসে কী? শ্যামা রমা বিশাখা দেবী বনলতা – নাম যাই হোক না কেন, সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয় যেখানে মানবিক সঙ্কট প্রবল সেখানেই অস্তিত্বচিহ্ন গুরুত্বহীন। যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হল তার চরিত্র। অতি সাধারণ চেনা জানা মেয়েটি জীবনের ঘটনাবহুল স্রোতে ভাসতে ভাসতে আর হাজারটা চরিত্রের মতো গড্ডালিকা প্রবাহে হারিয়ে গেল না, ভাগ্যের এক আশ্চর্য খেলায় সে হঠাৎই খুঁজে পেল জীবনের রহস্য সন্ধানের চাবিকাঠি। আলো আর আঁধারের চোখ ধাঁধানো খেলার মধ্য দিয়ে, হাজারটা চরিত্রের কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্যের বেড়াজাল ভেঙে, নিজের সীমা পেরিয়ে সে পাড়ি দিল অসীমের খোঁজে। না কি তারও ওপারে? একদিন যে জ্ঞানের বিদ্যুতাগ্নি তার চেতনাকে শিখিয়েছিল ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম’, যে জ্ঞানজ্যোতিঃ একদিন তার কাছে উদাত্ত কণ্ঠে গেয়েছিল তার অবচেতনের ঘুমভাঙানিয়া সঙ্গীত ‘অয়মাত্মানং ব্রহ্ম’, একদিন সেই জ্ঞানের আলোই তাকে বুঝতে শেখাল সীমা আর অসীমের আপাত বিভেদের অন্তস্থলে লুকিয়ে থাকা অভেধ সত্য ‘তৎত্বম অসি’। সেই জ্ঞানই অবশেষে তাকে নিয়ে গেল সীমা-অসীমের ওপারে এক একমেবাদ্বিতীম সত্যে – ‘অহম ব্রহ্মাস্মি’-র অতিচেতনে।

বইটির পাণ্ডুলিপি শেষ করার পর অনিরুদ্ধ বসুর এই অসাধারণ সৃষ্টিকে কী বলে সাধুবাদ জানাব ভেবে পাচ্ছিলাম না। বহুমাত্রিক এই উপন্যাসটি হয়ত সবাই একই দৃষ্টিতে দেখবেন না। সেটা সম্ভবও নয়, কাম্যও নয়। শুধু এই আশা করব, এই অপূর্ব কাহিনিটি কিছু সেরিব্রাল পাঠককে ভাবনার খোরাক যোগাক।

এমন একটি গণ্ডিভাঙা ব্যতিক্রমী উপন্যাস উপহার দেওয়ার জন্য লেখকের কাছে বাংলা উপন্যাস-সাহিত্য ঋণী থাকবে, যদিও এ আমার নিজস্ব অনুভূতি।

ধন্যবাদান্তে

আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

 

Aniruddha Bose
 অনিরুদ্ধ বসুর নতুন উপন্যাসটির ভূমিকা লেখার আগে পাণ্ডুলিপিটি পড়ে শেষ করলাম। বইটা পড়ার সময় এবং পড়ার পরে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। এক কথায় অনুভূতিটা বোঝানো যাবে না। বিরক্তি, রাগ, দুঃখ, হতাশা এবং আশা, সব কিছু আবেগের আঁচে আর যুক্তির ছুরিতে তালগোল পাকিয়ে গলার কাছে একটা অব্যক্ত কান্নার দলা হয়ে আটকে গেল।
সত্যি কথাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে রীতিমতো সাহস লাগে। সর্বক্ষেত্রে বাঙালির পিছিয়ে যাওয়াটা দুঃখের, কিন্তু ভয়ের নয়। সাময়িক পিছিয়ে পড়াটা জাগতিক নিয়মের মধ্যেই পড়ে। পিছিয়ে পড়লেও আবার এগোনো যায়, যদি ...

এই যদিটাই এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। এই যদিটা যখন মানসিক ক্লীবত্বে পরিণত হয়, তখনই হয় ভয়। বাংলা এবং বাঙালির ভবিষ্যতের জন্য ভয়। মানসিক জড়তা জন্ম দেয় এক আশ্চর্য উন্নাসিক কূপমণ্ডুকত্ব। তার প্রধান লক্ষণ অতীতকে আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যতকে অস্বীকার করা। ‘এই বেশ ভালো আছি’ মানসিকতা যখন মিশে যায় ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’ আর ‘আমি বা আমরাই শ্রেষ্ঠ’ মনোভাবের সঙ্গে, তখনই ঘটে একটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা জাতির অবক্ষয়। তখন কেউ এদিকে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলে তাকে প্রথমে উপেক্ষা, তারপর বিদ্রুপ এবং তারপর ছোট করার চেষ্টা করা হয়।

অনিরুদ্ধ বসু তার নতুন উপন্যাস ‘স্ফুলিঙ্গ’-তে এই কঠিন অপ্রিয় কাজটি করার চেষ্টা করেছে। কলা বা কৃষ্টি ক্ষেত্রে বাংলা ও বাঙালি যে ক্রমাগত পিছিয়েই যাচ্ছে, মধ্যমেধার রাজত্বে যে নতুন প্রতিভাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেওয়ার একটা ঘোর চক্রান্ত চলছে, অনিরুদ্ধ বসুর সাহসী কলমে তা উঠে এসেছে।

কিন্তু অনিরুদ্ধ বসু শুধু কালো রঙটাই দেখায়নি। ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন শ্মশানভূমি থেকে আলোর পাখি ফিনিক্সের উঠে আসার মতো তার উপন্যাসের প্রটাগনিস্টের লড়াই করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার গল্পও শুনিয়েছে।

আজ অনিরুদ্ধ বসুর উপন্যাসটির ভূমিকা লিখতে বসে একটাই কামনা করছি, এই কাল্পনিক ‘স্ফূলিঙ্গ’ সত্যের দাবানলে পরিণত হয়ে বাংলার কৃষ্টিজগতের পূঞ্জীভূত জঞ্জালে খাণ্ডবদহনের সৃষ্টি করুক, যাতে সেই পোড়ামাটির গর্ভ থেকে ফিনিক্সের মতো নতুন প্রজন্মের প্রতিভাশালী অঙ্কুরগুলি জন্মায় এবং কালক্রমে মহীরূহে পরিণত হয়।
Aniruddha Bose
খুনের ও ভূতের বইয়ের বাজারে ভালো কাটতি বলে প্রকাশিকার কাছ থেকে যখন অনুরোধ আসে, তখন কতগুলো চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।প্রাইভেট ডিটেকটিভকে কেন্দ্র করে গল্প লেখার ট্র্যাডিশনটা কেমন যেন একঘেয়ে। ১৮৩৩ সালে এক ফ্রেঞ্চ সৈনিক, অপরাধী ইউগিন ফ্র্যাঙ্কয়েস ভিডক, কয়েকজনকে নিয়ে ‘লে ব্যুরো ডেস রিসেইনমেন্টস ইউনিভারসেলস পউর লে কমার্স এট ল্য ইন্ডাস্ট্রি’ নামে প্রথম ডিটেকটিভ এজেন্সি স্থাপন করেন। ১৮৪২ সালে পুলিস ওনাকে জালিয়াতির অপরাধে অ্যারেস্ট করে। ভিডক ও চার্লস ফেড্রিক এই দুজনের হাত ধরেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ কনসেপ্টটা সাহিত্যে স্থান করে নেয়, যার ভিত্তিতে এডগার অ্যালেন পোর সি আগস্টা ডুপিন ১৮৪০ সালে প্রথম প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে সাহিত্যে আসে। তারই ভিত্তিতে বহুজন ডিটেকটিভ সাহিত্যে স্থান করে নেয়।কতগুলো চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।·   মৃত্যুর সময় পুলিস না ডিটেকটিভ, কে ইনভেস্টিগেশন করতে যায়?·  খুনের কিনারার জন্য বর্তমান যুগে ক’জন ডিটেকটিভের শরণাপন্ন হয়?·  ডিটেকটিভদের কী পুলিস রিপোর্ট, ফরেনসিক রিপোর্ট জানার অধিকার আছে?·   তারা কী টেলিফোন কিংবা ইন্টারনেট ট্যাপ করতে পারে?·   তারা কী ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ইন্সিওরেন্স ও অন্যান্য ব্যাক্তিগত তথ্য কারও সম্মতি ছাড়া জানতে পারে? উত্তর একটাই - না। তাহলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ একটি আজগুবি কনসেপ্ট, যা একবিংশ শতাব্দীতে ভিত্তিহীন। আজকের বাস্তবতা মাথায় রেখেই এধরনের উপন্যাস লেখা বাঞ্ছনীয়। এমনও তো হতে পারে, খুনের ইনভেস্টিগেশন প্রথাগত ভাবেই হচ্ছে, অথচ তার সলিউশন একাধিক ব্যক্তির যুগ্ম প্রয়াসে এগিয়ে গিয়ে তাদের মধ্যেই একজন শেষ করে। উপন্যাসে তাই শুধু খুনিকেই নয়, ফাইন্যালি জ্যাকপট জেতা মানুষটিরও সন্ধান পাঠক করতে পারে। যে হয়ত তদন্তকারীদের মধ্যে নয়।ছুরি, পিস্তল এসবের বদলে অন্যভাবেও তো খুন করা যায়। সেই সব অজানা খুনের অস্ত্র কিছুটা আমার ডাক্তারি জ্ঞান, কিছুটা অন্যান্য ডাক্তার ও সায়েন্সের বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে, নতুন আঙ্গিকে প্রকাশিত হয় সেপ্টেম্বর ২০১০-এ। কল্পনার ডিটেকটিভকে পেছনে ফেলে, একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা মাথায় রেখে, প্রচলিত দেশি ও বিদেশি প্রথার গণ্ডি ভেঙে, নতুন দৃষ্টিকোণে বৈজ্ঞানিক খুনের তথ্য দিয়ে নতুন ছাঁচে একটা রহস্য উপন্যাস লেখার চেষ্টা।ভারতের বিভিন্ন শহরে অসংখ্য মৃত্যুর জাল ফাঁদা। কে নেই সেই চক্রে?  সিনেমা, মডেল, ধর্মগুরু ভণ্ড বাবা, সো-বিজ দুনিয়ার ডন, প্রগতিশীল ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, মেধাবী ছাত্র, প্লাস্টিক সার্জেন, সাবেকি পুলিস - সব্বাই। ডবল হেলিক্সের মতো অসংখ্য খুনের মধ্যে রহস্য পেঁচানো হলেও পাঠক উদগ্রীব হয়ে থাকবে গল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত। খুন আর খুনির বিবর্তন আনতে সক্ষম হই। শেষ হয় খুনের নতুন দর্শনে।উপন্যাসটি বারবার বেস্টসেলারের তালিকায় পৌঁছয়। পরে এর ইংরেজি ভাবানুবাদ আমার দাদা পার্থ প্রতিম রায় “ফালক্রাম” নাম দিয়ে করেন, যা প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১৩-তে। ভাবানুবাদ করার সময় কতগুলো চরিত্রের ও ঘটনার বিশদ উপস্থাপনা করেন, যা এই উপন্যাসে অবশ্যম্ভাবী হলেও, প্রথম প্রকাশনায় সেভাবে বর্ণিত হয়নি। তাঁর সেই উল্লেখিত অংশগুলো, দ্বিতীয় সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হল, যা এই উপন্যাসেকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। আমি তাঁর কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।পরিবর্ধিত “চক্র” উপন্যাস দ্বিতীয় সংস্করণ আপনাদের হাতে তুলে দেওয়ার আগে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানাই। উনি এই উপন্যাসে নানা সংযোজনে বিশেষ সহায়তা করেছেন।আশা করি এই লেখা আগামীকে রহস্য উপন্যাস সাহিত্যে নতুন দিশা দেখাবে।অনিরুদ্ধ বসু
©2017 GoogleSite Terms of ServicePrivacyDevelopersArtistsAbout Google
By purchasing this item, you are transacting with Google Payments and agreeing to the Google Payments Terms of Service and Privacy Notice.